Showing posts with label student life bangladesh. Show all posts
Showing posts with label student life bangladesh. Show all posts
জুনাইদের গল্পটা !!!!
মো. জুনাইদের কাছে ‘মা’ ও ‘বাবা’ সবচেয়ে কঠিন দুই শব্দ। তাঁর বয়স যে ঠিক কত, তা আমরা জানি না, জুনাইদ নিজেও জানেন না। না-জানা বয়সী এ জীবনে কখনো কাউকে মা-বাবা বলে ডাকার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন কক্সবাজারের ঝাউতলায়। জুনাইদকে হয়তো পথেই পেয়েছিলেন নাজিরাটেকের নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ সাহারা খাতুন। শুঁটকির আড়তে কাজ করতেন তিনি, শীতকালে পিঠা বেচতেন। জুনাইদের বয়স যখন পাঁচ-ছয়, তখন সাহারাও চিরবিদায় নিলেন। যার হারানোর কিছুই ছিল না, সে–ও একদিন একজনকে হারিয়ে ফেলল! সঙ্গে হারাল মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুও। জুনাইদ ফিরে গেল তাঁর পুরোনো ঠিকানায়—পথে।
সাহারা খাতুনকে নানি ডাকত জুনাইদ। তাঁর আশ্রয়ে থাকার সময় লাকড়ি জোগাড় করা, শুঁটকি শুকানোর মতো কাজ করেছিল সে। পথে নেমে শুরু করল কাগজ টোকাতে। ঘুমাত খোলা আকাশের নিচে—মাটিতে। কপাল খুব ভালো থাকলে কোনো ছাউনির নিচে—মেঝেতে। খাবার বলতে ছিল উচ্ছিষ্ট। বিশেষ করে সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে যাওয়া মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার। এভাবে বছর দু-এক কেটে গেলে জুনাইদ একটি চায়ের দোকানে কাজ পেল। ছোট্ট জীবনে সেটিই ছিল বড় প্রাপ্তি। কারণ, চালচুলো নেই বললেই লোকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। কাজ দিলে সব নিয়ে যদি ভেগে যায়, তখন কোথায় পাবে তাকে। তবে জুনাইদ সাড়ে তিন বছরে একাধিক দোকানে কাজ করল নিষ্ঠার সঙ্গে। কারও কাছে হাত পাতল না, কারও কিছু চুরিও করল না। তারপরও মানুষ তাঁকে উঠতে-বসতে গালাগাল দিত কিংবা মারপিট করত! জুনাইদ ভেবেছিল, এটাই বুঝি নিয়ম।
সমুদ্র ও সিনেমা
ওই নিয়মে নিজেকে আর মানিয়ে নিতে পারছিল না জুনাইদ। ২০১০-১১ সালে গেল টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে। এক জেলে পরিবারের সঙ্গে চুক্তি হলো। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবে, মাছ ধরার কাজ না থাকলে পাহাড় থেকে লাকড়ি এনে দেবে; বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। খুশি মনে রাজি হলো সে। রাত জেগে নৌকা বেয়ে যায় সমুদ্রে, জাল পেতে মাছ ধরে। মাঝেমধ্যে পাহাড়ে যায়, লাকড়ি জোগাড় করে এনে হাটে বেচে টাকা বুঝিয়ে দেয়। আর সুযোগ পেলেই বাজারের চায়ের দোকানের বাঁশের বেড়ার ফুটোয় চোখ রাখে। সিনেমা দেখার বেজায় নেশা ধরে গেছে তত দিনে। বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি—সব সিনেমাই গোগ্রাসে গেলে সে। তবে নিয়ম হলো, পয়সা দিয়ে চা-নাশতা খেতে বসলেই কেবল সিনেমার অদৃশ্য টিকিট মিলবে। তাই দোকানিরা বেড়ার ফুটোতে চোখ দেখলেই ‘পানি মারতেন’, ধাওয়া করতেন। এত কিছুর মধ্যেও আমির খানের থ্রি ইডিয়টস দেখে ফেলল জুনাইদ। তাঁর কথায়, ‘এই সিনেমাটা দেখে পড়াশোনার খুব আগ্রহ হলো। আর কক্সবাজারের বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দেখলেই মনে হতো, ইশ্, আমিও যদি পড়তে পারতাম! মনে হতো, কেউ যদি বলত, তুই সারা দিন টয়লেট পরিষ্কার করার বিনিময়ে স্কুলে পড়তে পারবি, তার পরও আমি তা-ই করব।’
ওই ইচ্ছের সলতেটা আরও উসকে দিয়ে গেল সমুদ্রের এক বন্ধু, যার নাম জুবায়ের। বয়সে সে জুনাইদের ছোটই ছিল, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিরতি নিয়েছিল। সমুদ্রে মাছ ধরতে যেত জুনাইদের মতোই। হঠাৎ একদিন সে বলল, আর মাছ ধরতে আসবে না, আবার স্কুলে যাবে। জুনাইদ বলল, ‘আমিও তো স্কুলে যাইতে চাই। তুই একটা ব্যবস্থা করবি আমার জন্য?’ জুবায়ের দিল জাহাঙ্গীর স্যারের ঠিকানা। বলল, ‘জাহাঙ্গীর স্যার ভালো মানুষ। তাঁর কাছে গিয়া বুঝায়া বললে ব্যবস্থা হবে।’
মৌসুনী দ্বীপে
জাহাঙ্গীর স্যার ঠিকই ব্যবস্থা করলেন। যে ছেলের বর্ণপরিচয় নেই, তার ওপর আস্থা রাখলেন। নুরুল আমিন নামের আরেক ছাত্রের কাছে পাঠালেন জুনাইদকে। এর মধ্যে জুনাইদ অনেক কষ্টে জমানো ১০ টাকা দিয়ে কিনল ‘বাংলা শিক্ষা’ ও ‘মাই স্পেলিং বুক’। বই কেনার তারিখটাও ঠিক মনে রেখেছেন জুনাইদ—২০১১ সালের ৭ অক্টোবর! সে সময় রাত জেগে মাছ ধরতেন, সুযোগ পেলেই কুপির আলোতে নৌকায় খুলে বসতেন বই দুটি। দিনেও ঘুমাতেন না, বই খুলে বসতেন। জুনাইদ বলছিলেন, ‘কেউ বিশ্বাস করে না, কিন্তু আমি ১০ দিনে দুটি বই-ই পড়ে শেষ করলাম। এক শটার মতো ইংরেজি শব্দও শিখে ফেললাম। আর মাঝেমধ্যে জাহাঙ্গীর স্যার যেখানে প্রাইভেট পড়াতেন সেখানে যেতাম। পাশে দাঁড়িয়ে থেকেই ৪৫ ডিগ্রি কোণ আঁকাও শিখে ফেললাম। তারপর একদিন স্যারকে বললাম, স্যার, আমিও পরীক্ষা দেব। স্যার রাজি হলেন। প্রাইভেটের ওই পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় হলাম।’
জাহাঙ্গীর স্যার বিস্মিত হয়েছিলেন কি না, জানা নেই। হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। তাই হয়তো তিনি জুনাইদকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু ওই জেলে পরিবার ভীষণ বেঁকে বসল। জুনাইদ নৌকায় একটা পড়ার টেবিলের মতো বানিয়ে নিয়েছিলেন, সেটাও লাথি মেরে পানিতে ফেলে দিল। বলল, ‘শখ কত!’ লোকে হাসাহাসি করতে লাগল। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘পড়াশোনা করে তুই কী হবি?’ কিশোর জুনাইদ বলল, ‘ইঞ্জিনিয়ার হব।’
২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে মাছ ধরার কাজে বিরতি দিল জুনাইদ। কাঠমিস্ত্রির কাজ করে জোগাড় করল ১ হাজার ৬০০ টাকা। ওই টাকা, জাহাঙ্গীর স্যারের সুপারিশ আর বুকভরা সাহস নিয়ে সে গেল টেকনাফের মৌসুনী দ্বীপের ল্যাদা জুনিয়র হাইস্কুলে। অনেক অনুনয়ের পর, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুনাইদ এক লাফে ভর্তি হলো অষ্টম শ্রেণিতে। নিজের টাকায় বই, স্কুলের পোশাক কিনল। কিন্তু খেয়ে-পরে বাঁচতে তো হবে। তাই আবারও গেল মাছ ধরতে। সারা রাত মাছ ধরে কোনোরকমে স্কুল ড্রেস পরে, বই-খাতা বগলদাবা করে ছুটে যেতে লাগল স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে। আর বাকি ছাত্রছাত্রীরাও তাকে দেখে জায়গা করে দিতে লাগল তড়িৎগতিতে। জুনাইদ বলছিলেন, ‘গোসল না করেই স্কুলে যেতাম আমি, ফলে শরীরে মাছের ভয়ানক গন্ধ লেগে থাকত। সে কারণেই ওরা জায়গা করে দিত।’ এই করে করেই জুনাইদ একদিন জেএসসি পরীক্ষায় পেলেন জিপিএ-৫!
দ্বিতীয় জীবন
নবম শ্রেণিতে পা রাখার আগে ইটভাটায় কাজ নিল জুনাইদ। কাঠমিস্ত্রির কাজও করল। তিন হাজার টাকা জোগাড় হওয়ার পর গেল টেকনাফের হ্নীলা হাইস্কুলে। ভর্তি হল সেখানে। প্রধান শিক্ষক তাঁর ভাইয়ের বাসায় জায়গির হিসেবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ছোট দুটি শিশুকে পড়াতে হতো। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সেখানে টেকা গেল না। এসএসসি পরীক্ষার আগ দিয়ে স্কুলেরই হোস্টেলে ওঠার সুযোগ হলো। কিন্তু সকালে নৌকা থেকে ফিরে সময়মতো অ্যাসেম্বলি ধরতে না পারায় শিক্ষকেরা চেপে ধরলেন, ‘সমস্যা কী তোর? হোস্টেলে থেকেও স্কুলে আসতে দেরি কেন?’ জুনাইদ তত দিনেও শিক্ষকদের কাছে তার মা-বাবার কথা বলেনি। একই কাজ সে করেছিল আগের স্কুলেও। কারণ, মা-বাবার পরিচয় নেই, এমন কোনো ছেলেকে কেউ সুনজরে দেখে না। জুনাইদ বাধ্য হলো সব খুলে বলতে। এবং তার পর থেকে কোনো কোনো শিক্ষক সুযোগ পেলেই তাকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিতেন! তবে জুনাইদের কথা, ‘ভালো শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। তাঁরা না থাকলে তো আমি এতটুকু পথ আসতে পারতাম না। স্কুলের বেতন, পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফি—সবই তাঁরা দিয়েছেন। এভাবেই আমি এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.৮৩ পেলাম।’
এরপর জুনাইদ ভর্তি হন উখিয়া ডিগ্রি কলেজে। কলেজে পড়ার টাকা জোগাড় করতে শুরু করলেন রাজমিস্ত্রির কাজ। ফলে ক্লাস শুরু হওয়ার এক মাস পর কলেজে যাওয়ার সুযোগ হলো। আবারও জায়গির থাকলেন। কলেজ বেতন মওকুফ করে দিল। টিউশন শুরু করলেন। নিজে কিন্তু কখনো কারও কাছে প্রাইভেট পড়েননি। তারপর একদিন বন্ধুদের মেসে উঠলেন জুনাইদ। থাকা-খাওয়া ফ্রি, শুধু বন্ধুদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে হতো।
তারিখটা ঠিক মনে রেখেছেন জুনাইদ—২০১৭ সালের ৩০ মার্চ। দুদিন পর এইচএসসি পরীক্ষা। ঠিক করলেন, স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে আসবেন। উঠে বসলেন অটোরিকশায়। খানিক বাদেই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন চার যাত্রীর দুজন। জুনাইদের অবস্থাও সাংঘাতিক। পেট ফুঁড়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেরিয়ে গেছে। চোখ আর মাথায় কঠিন আঘাত। শরীরের অধিকাংশ হাড়ই ভেঙে গেছে। বন্ধুরা ছুটে এলেন। অ্যাম্বুলেন্সে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার পথে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিলেন, জুনাইদ আর নেই, হৃদ্যন্ত্র থেমে গেছে। উখিয়ায় ফিরে আসছিল অ্যাম্বুলেন্সটি। কিছু দূর যাওয়ার পর জুনাইদের হৃৎপিণ্ড জানান দিল, এখনো থামিনি! মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন জুনাইদ। পরীক্ষা দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। প্রায় এক বছর চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতাল ও কুতুপালংয়ের এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকার পর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলেন তিনি। মাঝে তো শুনেছিলেন, জীবনে আর চোখ মেলে তাকাতে পারবেন না, পা দুটিও চলবে না। জুনাইদের ভাষায়, ‘বন্ধুবান্ধব, কলেজের শিক্ষকেরা না থাকলে কী হতো, জানি না! অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে এসেছি আমি। হয়তো আমার স্বপ্ন পূরণের জন্যই ওপরওয়ালা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’
জুনাইদের স্বপ্ন
এক বছর পর, ২০১৮ সালে আবার এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বসেন জুনাইদ। তাঁর ভাষায়, ‘যে সময় সবাই মা-বাবার আদরে পড়াশোনা করে, সে সময় আমি অসুস্থ শরীরে ইট ভেঙে খাবার জোগাড় করেছি, ভাঙা পা ড্রেসিং করে পরীক্ষা দিয়েছি।’
এত কিছু করে জুনাইদ এইচএসসিতে জিপিএ-৪.৫০ পেয়েছেন। বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকদের সহযোগিতায় পরীক্ষা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুযোগ পেয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু শেষমেশ বেছে নিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিষয়টি।
ফোনের ওপাশে কাঁদছিলেন জুনাইদ। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি কী?’ জুনাইদ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে বললেন, ‘অ্যাকসিডেন্টের পর যেদিন চোখ মেলে তাকাতে পারলাম, সে স্মৃতিটা খুব আনন্দের। আর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ পাওয়ার স্মৃতিটাও। ওই যে ছোটবেলায় সমুদ্রে নৌকায় একজনকে বলেছিলাম না, ইঞ্জিনিয়ার হব, সে কথা মনে পড়ছিল তখন!’
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারে প্রথম হয়েছেন জুনাইদ। শিক্ষক ও বন্ধুদের সহযোগিতায় দারুণ আপ্লুত এখন তিনি। পে ইট ফরওয়ার্ড বাংলাদেশ নামে এক সংগঠন বৃত্তির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। তাঁর এখন একটাই স্বপ্ন, প্রকৌশলী হবেন। মমতা কিংবা টাকার অভাবে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করবেন। জুনাইদ বলছিলেন, ‘আপনারা তো ফোন পেলে বিরক্ত হন, কিন্তু আমাকে হঠাৎ কেউ ফোন করলে কী যে ভালো লাগে বোঝাতে পারব না! আমার কলেজের এক শিক্ষিকা মাঝেমধ্যে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, “রাতে কী খেয়েছ? ” তখন আমার চোখে পানি এসে যায়। আমার এখন স্থায়ী ঠিকানা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হল। আমার জীবনে কষ্টের শেষ নেই, কিন্তু মানুষের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। মানুষের সব কষ্ট আমি দূর করতে চাই।’
জুনাইদের গল্পটা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়, তাই না?
হ্যাঁ আমি !সেদিন হলের ছাদে উঠলাম
November 04, 2019
1 Comment
drop life student
dropper
last banchers
life
my life
student life bangladesh
ড্রপ খাওয়ার আগ পর্যন্ত বুঝতে পারি নাই এইটার যন্ত্রনা আসলে কি ।
আমি সাবেক চবিয়ান ।
খুব বেশিদন হয়নি চবি ছেড়েছি । যখন ড্রপ খেয়েছিলাম তখন আস্তে আস্তে চেনা জগতটা অচেনা হয়ে গেলো । আমার কোন বন্ধুকে পাই নি ওই সময়টায় আমার পাশে ছিল । ক্লাসে নিত্যদিন অপমান ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার । আস্তে আস্তে ক্লাসে যাওয়া বাদ দিলাম ।
ছেলেরা নাকি কোন কিছুতেই কাঁদে না । কিন্তু আমি কেঁদেছিলাম । অনেক চেষ্টা করেও ওই সময়টা নিজেকে আর ট্র্যাকে আনতে পারি নি । আমি চেষ্টা করেছি । লাভ হয়নি । নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিলাম ।
সব থেকে খারাপ লাগলো ওইদিন যেদিন আমার এক ম্যাডাম বললেন , কতোদিন ক্যাম্পাসে থাকবা ? লজ্জা করে না ? তোমার জায়গায় আমি হলে আত্মহত্যা করতাম !!
ওইদিন হলে ফিরে এসে ভাবলাম , আমার কি সুইসাইড করা উচিত ?
সুইসাইড করা উচিত কিনা সেটার উত্তর পেলাম পরের দিন । আমার এক স্যার কথায় কথায় বলে বসলেন , টাকা কামাই করবে কবে ? আদৌ চাকুরী করতে পারবা ?
বুঝলাম আমার মতো ছেলেদের সুইসাইড করাই উত্তম ।
অনেক সাহস নিয়া সেদিন হলের ছাদে উঠলাম । রাত বাজে ২ টা । আমি মরে গেলে কেউ দেখবেও না । হয়তো দয়া করে কেউ ""মেধাবী "" শব্দটা ইউজ করতে পারে । মনে অনেক চাপ । পরশুদিন আবার ৩ ক্রেডিটের এক্সাম । এক্সাম দেয়ার মতো অবস্থা নাই ।
সুইসাইড করতে পারলাম না । সেদিন রাত ৩ টায় রুমে ফিরলাম । ঘুমাতে পারলাম না সারারাত ।
কোন রকমে এক্সাম দিলাম । এক্সাম হলেও স্যারদের কটাক্ষ ছিল আমার নিত্য সঙ্গী । ততোদিনে আমি নষ্ট হয়ে গেছি ।
এরপরেও বিপর্যয়ের মুখে এক্সাম গুলো দিয়ে গেলাম । সব মনোবল এক করে পড়াশুনা করতে লাগলাম । জানি আমার পেছনে কেউ নাই । একা শুধুই একা নিজের রাস্তা চলেছি আমি । রাত জেগে সিভি বানাইতাম । আমি জানি কোন স্যার আমাকে রিকমেন্ড করবে না । আমি জানি সুইসাইড করলে কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না । পুরো মাস্টার্সে আমি শুধু নিজের পড়াশুনা আর সিভির পেছনেই টাইম দিলাম । প্রতিদিন মনে হতো মরে যাবো । তারপরেও যেন কিভাবে বেঁচে রইলাম ।
যাই হোক এতো ইমো খাওয়ার দরকার নাই ।
আগে ইমো খাইতাম । এখন আর খাই না । এখন আমি জব করছি । স্পিডের নাম শুনেছেন ? কিংবা মজো অথবা ক্লেমনের নাম ? ফ্রুটিকার নাম শুনেছেন ? আমি সেই ফ্যাক্টরিতে এক্সিকিউটিভ হিসাবে চাকুরী করি । এইটা ছিল আমার থার্ড ইন্টারভিউ । এখানে মেধা তালিকায় প্রথম হয়ে আমি জব নিয়েছি । ভালো বেতন দেয় । আপনার হাতের যে স্পীডের ক্যানটা ঘুরছে অথবা ফ্রুটিকা খাচ্ছেন সেটা আমার সাইন ছাড়া বাজারে যায় না । প্রথম সাইনটা আমি করি । প্রোডাক্ট ঠিকাছে কিনা সেটা আমি জাজ করি ।
আমার যে ম্যাডাম আমাকে সুইসাইড করার খোচা দিয়েছিলেন তাকে আমি উপহার স্বরূপ এক কাটন জুস পাঠিয়ে দিয়েছি । আর আমার যে স্যার আমাকে ইনকাম করার খোঁচা মেরেছিলেন তাকে আমি ইনটেক ৪৮ টা স্পীডের ক্যান পাঠিয়ে দিয়েছি ।
জীবনটা সুইসাডের জন্য নয় ।
দোয়া রাখবেন যেন আরো ভালো জায়গায় যেতে পারি । ড্রপ খাওয়া মানেই সব শেষ নয় ।
কালেক্টেড

মেসে থাকি তো
সম্প্রতি পুলিশের এসআই নিয়োগ পরীক্ষা চলছে। একটি ছেলে কাগজপত্র সত্যায়ন করতে আসে। নিজের রুমে বসে আছি, হাত মুখ ধুয়ে মাত্র দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় সে এসে হাজির। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু করছিল, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলাম।
প্রথম ধাক্কায় মনে হল, ছেলে নেশাআসক্ত নয়ত শারীরিকভাবে অসুস্থ। কাগজপত্র এগিয়ে দিল, আমি একে একে সাক্ষর করছি আর অল্পস্বল্প তার বিবিধ জিজ্ঞেস করছি। এই আলাপপর্ব আমি প্রায়শ করে থাকি।
-বাবা, তুমি কি নেশাটেশা কর?
-না, স্যার।
-রাত জাগো?
-জ্বী না স্যার।
ছেলেটির লিকলিকে শরীর আর কাগজপত্র, ছবি স্বাক্ষরের সময় যখন একটা একটা কাগজ টেনে নিচ্ছিল তখন খেয়াল করছিলাম ছেলেটির হাত ঈষৎ কাঁপছে। তাই ভণিতা না করে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলাম।
-তাহলে তোমার এই অবস্থা কেন? দেখে তো সুস্থ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
-(সলজ্জভঙ্গিতে উত্তর দিল) মেসে থাকি তো, খাওয়া-ঘুমের ঠিক নেই স্যার।
-(সলজ্জভঙ্গিতে উত্তর দিল) মেসে থাকি তো, খাওয়া-ঘুমের ঠিক নেই স্যার।
জিজ্ঞেস করলাম, টিউশনি কর কয়টা?
-তিনটা। এই মাসে আর একটা নিয়েছি।
-কত পাও সব মিলিয়ে?
- ছয়-সাত হাজার!
-টাকাগুলো দিয়ে কী কর?
-বাড়িতে পাঠাই কিছু, গ্রামে বাবা-মা আর ছোট একটা ভাই থাকে। বাকিটা মেস ভাড়া, মিল খরচ আর পড়াশোনার ব্যয় স্যার।
-বুঝলাম, তুমি তোমার খরচ চালিয়েও বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছো। কিন্তু তোমার স্বাস্থ্যের এই ভগ্নদশা কেন? খাওয়া-দাওয়া নিয়মিত কর না?
-করি স্যার। (ছেলেটি এবার কুঁকড়ে যায়) তবে সব-সময় খাওয়া হয় না। সকালে ভার্সিটিতে আসি, ক্লাস শেষ করে টিউশনিতে চলে যাই। মেসে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা-এগারটা। টিউশনির বাসায় যে নাস্তা দেয় তাই দিয়ে দুপুরেরটা চালিয়ে নিই; অবশ্য কখনও-সখনও দেয়ও না। এভাবেই দিন চলে।
আমি গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। দুই সেট অনেকগুলো কাগজ স্বাক্ষর করতে করতে এক সময় মনে হল, কলম আর চলে না। আমি আর ওর দিকে তাকাতে পারছি না।
মাথাটা নিচু করে বললাম-
-মাঝে সাঝে খেতে না পারলে অন্তত মুড়ি খাবে। তবুও খালি পেটে থেকো না। মুড়ি খেয়ে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে নেবে। দেখবে শরীরে অনেক বল পাবে।
-মাঝে সাঝে খেতে না পারলে অন্তত মুড়ি খাবে। তবুও খালি পেটে থেকো না। মুড়ি খেয়ে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে নেবে। দেখবে শরীরে অনেক বল পাবে।
ছেলে এবার যা বলল, এর জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। খুব ক্ষীণকণ্ঠে হা করা মুখের দিকে হাতটা নিয়ে তর্জুনি দিয়ে মাড়ির দিকে নির্দেশ করে বলল-
-স্যার, গত কয়েকদিন ধরে মুড়িই খেয়ে আছি। এই মাসের মেস ভাড়া, মিল খরচের টাকা দিতে পারিনি। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার টাকা আর গত মাসে বাড়িতে গিয়েছিলাম মাকে দেখতে; মা অনেকদিন ধরে পীড়াপীড়ি কান্নাকাটি করছিলো, অনেকদিন বাড়ি যাই না-বাড়ি যেতে অনেক ভাড়া আর খরচের ব্যাপার; ছোট ভাইটা অনেক আবদার করে রাখে; আব্বা অন্যের আমবাগানে কাজ করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে কোমর ভেঙে বেশকিছু দিন শয্যাশায়ী। মা শুধু কাঁদে আমাকে এক নজর দেখবে, তাই গেলাম। অনেক খরচ হয়ে গেল গত মাসে।
আমি বাকরুদ্ধ, নিশ্চুপ হয়ে শুধু শুনছিলাম। গলাটা আমার ধরে আসছিল। এতক্ষণ ওকে আমার বানভণিতাহীন জিজ্ঞাসাকে বড় বাতুলতা মনে হল। স্বাক্ষর সমাপ্তে শুধু একটাই প্রশ্ন করলাম।
-এই যে এসআই পরীক্ষা দিতে খুলনা যাচ্ছো, ভাড়া আছে যাওয়ার?
জীবনের রূঢ়তায় কতটা অনিশ্চিত এই যাপন। ছেলেটা উত্তর দিল-
- না, নেই স্যার। যাব কি না মনস্থির করি নাই। দেখি, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে ধার চাইব। যাওয়া-আসা এক হাজার টাকা হলেই হয়ে যাবে। কিন্তু জানি না ব্যবস্থা হবে কিনা! তবুও কাগজপত্র ঠিক করে রাখলাম।
এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম ওকে। বুঝতে পারছিলাম এই অর্ধবেলা পর্যন্ত ছেলেটির পেটে কোন দানাপানি পড়েনি। আমার লাঞ্চবক্সে দুইটা রুটি ছিল। দুজনে ভাগ করে খেলাম। ও খেতে চায়ইনি। এক প্রকার জোর করে বসালাম।
সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র শিক্ষক আমি, মানিব্যাগ সার্চ করে দেখি বেশি টাকা নাই। এক কলিগকে ফোন করে বললাম, এক হাজার টাকা ধার দিতে পারবে কিনা। বলল, পারবে। ছেলেটিকে নিয়ে আসতে পাঠালাম। নিয়ে আসলো। টাকা ওর হাতে দিয়ে বললাম, এই টাকা তোমাকে ধার হিসেবে দিলাম। চাকরি পেয়ে ফেরত দেবে।
প্রথমে নিতে খুবই আপত্তি করল। যখন দেখল, আমি সত্যি সত্যি ধার হিসেবে দিচ্ছি তখন আর দ্বিধা করল না।
আজ ফোন দিয়ে জানালো, সে প্রাথমিকভাবে এসআই বাছাই পরীক্ষায় নির্বাচিত হয়েছে। আমি আনন্দিত। ওর জন্য সবার দোয়া চাই। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন ওর মনে আশা পূরণ করে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জীবন সংগ্রাম কাছে থেকে না দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই। কত টাকা আমরা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে ওয়েটারকে বখশিস দিয়ে আসি। অনেক অহেতুক খরচ করি।
প্লিজ, একটিবার আপনার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রতিবেশী ছাত্রটির খবর নিন। তাকে সাহায্য নয়, ধার দিন। প্রয়োজনে লিখে রাখুন টাকার অংকটা, একদিন সে বহুগুণ ফেরত দেবে আপনাকে, জাতিকে।’
------------------------------------------------------------------------------
ড. শাহ মোঃ আরিফুল আবেদ সাহেবের ওয়াল থেকে নেয়া ।।
ড. শাহ মোঃ আরিফুল আবেদ সাহেবের ওয়াল থেকে নেয়া ।।
Subscribe to:
Posts (Atom)





















